মেঘ বৃষ্টি আলো

 

মেঘ বৃষ্টি আলো

32 mins
 
4.1K


(এক)


পর পর দুবার কলিং বেলের শব্দ পেয়ে সাধনাদেবী কিচেন থেকে ডাক দিলেন, মৌ...ও..মৌ দ্যাখ তো মা গিয়ে এই অসময়ে আবার কে এল?

মৌমিতা এই সময় মায়ের ডাকটা শুনে একটু বিরক্তই হল।তার ওঠে যাওয়ার একদম ইচ্ছে নেই। সবে গল্পের ক্লাইমেক্সে ঢুকেছে।নায়ক,নায়িকার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। এইবার একটু মানসিক বিশ্রামের দরকার।তারপর অনেক ভেবে চিন্তে তাদেরকে আবার ফেলে আসা জীবনের প্রত্যুষে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হবে।

এইখানে এসে একজন লেখক বা লেখিকার দায়িত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়।পাঠক,পাঠিকার মনে হাজার প্রশ্নের উদয় এই জায়গা থেকেই শুরু হয়।

তাই এখান থেকে বড্ড চিন্তা করে গল্পের উত্তরণ ঘটাতে হয়।এই সময়টাই স্রষ্টা নাওয়া,খাওয়া,শোওয়া পর্যন্ত ভুলে যান।তিনি যেন সত্যিকার নায়ক,নায়িকার অভিভাবক হয়ে ওঠেন। তাই তাদের ঘরমুখো না করা পর্যন্ত মনে একদম শান্তি থাকে না।

এই সময় যদি চেয়ার ছেড়ে উঠতে হয় সত্যি সত্যিই রাগ আসে।

মৌমিতা তাই একরকম বিরক্ত হয়েই ওঠে গেল।বুকের ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে,মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলো ঘুরিয়ে বেঁধে নিয়ে দরজাটা খুলল।

একজন মাঝ বয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছেন সামনে।একটু গোল টাইপের ,উচ্চতা খুব বেশি না। দাড়ি,গোঁফ কামানো।মাথায় পাতলা চুল।জিন্স,টিশার্টের সাথে কাঁধে একটা এক্সিকিউটিভ ব্যাগ ঝোলানো।

মৌমিতাকে এক ঝলক দেখে নিয়েই লোকটি হাতদুটো জড়ো করে বলে উঠলেন,নমস্কার মৌমিতা ম্যাডাম।আমি সুখেন ভৌমিক।ফ্রম নীল ভিসন প্রোডাকশন কম্পানি।আপনার সঙ্গে দুদিন আগেই ফোনে কথা হয়েছিল।আপনি বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দেখা করতে বলেছিলেন।একটু স্যুটিং-এ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম বলেই আসতে পারিনি।আজ এদিক দিয়ে পেরিয়ে যেতেই আপনার কথা হঠাৎ করে খেয়াল হয়ে গেল। আপনাকে ফোন করেছিলাম।বোধ হয় ফোনটা বন্ধ আছে। তাই কোন সাড়া না পেয়ে এই দুপুর বেলায় অসময়ে বিরক্ত করতে চলে এলাম।

  মৌমিতা সাথে, সাথেই হাসি মুখে বলে উঠল, আরে না..না। সেরকম কিছু না।আসলে এই সময়টায় আমি একটু লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকি।তাই ফোনটা অফ করে রাখতে হয়।আসুন..ভেতরে ..আসুন।বসুন ওখানে।আমি এক গ্লাস জল নিয়ে আসছি।

মিনিট তিনেকের মধ্যেই মৌমিতা জল আর মিষ্টি নিয়ে হাজির হল।তা দেখে সুখেন বলে উঠলেন,আরে...কি করছেন কী ম্যাডাম!..আমি খেতে এলাম নাকি?... আমি এসেছি কাজের কথা বলতে।খাওয়া,দাওয়া অনেক পরে হবে।

মৌমিতা আপ্প্যায়নের সুরে জবাব দিল, জানি।সে হলেও আপনি আমাদের অতিথি।

----সে যাই হোক এবার আপনি বসুন।কথা আছে।

মৌমিতা নিজেকে একটু পরিপাটি করে উল্টোদিকের একটা চেয়ারে বসে পড়ল।

সুখেন এক ঢোক জল খেয়ে বলে উঠলেন,আমি আপনার ব্লগের অনেকগুলো গল্প মন দিয়ে পড়েছি।এবং রীতিমত অবাক হয়ে গেছি।এত সুন্দর লেখার ধরণ!...অথচ ফেসবুকে লেখালেখি করছেন?...আসলে প্রথমবার ফেসবুকে এত সুন্দর, সুন্দর গল্প পড়লাম।তাই প্রশ্নটা চলে এল।তাবলে ফেসবুক যে ফেলনা জায়গা তা কিন্তু একেবারেই নয়।সে যাই হোক আমি আপনার ব্লগ থেকে তিনটে গল্প নেওয়ার জন্য সিলেক্ট করেছি।দুটো শর্ট ফিল্ম এবং একটা বানিজ্যিক সিনেমার জন্য। তাতে আপনার কী অভিমত বলুন?

মৌমিতা যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বলে উঠল,আপনি কোন তিনটে গল্পের কথা বলছেন বলুন তো?

শর্ট ফিল্মের জন্য "হঠাৎ বসন্ত" ও "কেয়া পাতার নৌকো" আর বিগ বাজেট ফিল্মের জন্য আপনার বড় গল্প "খুশির কোলে মেঘ জমেছে" মোট তিনটে গল্প আমি নিতে চাই।

-----সে তো খুব ভাল কথা।তা...এরজন্য আমাকে কী করতে হবে?

---একটা লিখিত নক দেবেন। আপনি গল্প তিনটের স্বত্ত আমাকে বিক্রি করছেন সেই মর্মে একটা চিঠি।যাতে পরবর্তীকালে কোন ঝামেলায় না পড়তে হয়।

এবার বলুন আপনার দাবী কী?

মৌমিতা একটু ভেবে বলে উঠল,আমি একজন লেখিকা।লিখতে ভালবাসি।তাই লিখতে বসা।এ ব্যাপারে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। আপনিই বলুন কত কী দেবেন?

----সেটা কী শোভনীয় হবে?

----অবশ্যই হবে।

-----এই ধরুণ তিরিশ হাজার।যদি আগামীদিনে তেমন সাফল্য আসে।আরো কিছু বোনাস পাঠিয়ে দেব।বলুন...রাজি আছেন?

----এটা আমি ঠিক দাম হিসেবে নিতে চাই না। লেখালেখির এই আয়টুকু,আমি পুরস্কার হিসেবেই নিতে চাই।তাই আর দর,দাম করছি না। আপনি খুশি মনে যেটা ভেবেছেন।তাই দেবেন। আর হ্যাঁ... যাই বানান।লেখিকা হিসেবে আমার নামটা যেন কোনরকম বাদ না পড়ে সেটা একটু দেখবেন।

----সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না ম্যাডাম।অবশ্যই থাকবে।

তারপর সুখেন ব্যাগ থেকে পেপার এবং টাকা একসাথেই বের করে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন,এটা বায়না হিসেবে দশ হাজার রাখুন।বাকিটা আপনি অফিসে এসে নিয়ে যাবেন।এটা কম্পানির ভিজিটিং কার্ড।...আর এটা হল।বন্ড পেপার।আপনি আপনার ব্যক্তব্যটি এর উপরে লিখে দিন।নিচে সাইন।

মৌমিতা সব তৈরি করে ধরিয়ে দিল।সুখেন প্রতি নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

মৌমিতা আস্তে করে দরজাটা ভাঁজ করে ছিটকানিটা তুলে দিল।তারপর হাতের টাকা কটা বুকের মধ্যে চেপে একটা দীর্ঘ নিশ্বাসে বুকটা উঁচু করে ফেলল।

দুফোঁটা জল এসে চোখের পলকদুটোকে অল্প ভিজিয়ে দিল।

এই জলটুকুতে অনেক কিছু মিশে আছে।মান,অভিমান,ভালোবাসা,ব্যর্থতা,সাফল্য এবং আনন্দ!!


(দুই)


---কী হল মৌ এসো।...এত রাত হয়ে গেল,এখনো তুমি ওখানেই বসে রইলে?..আর আমি একা,একা তোমার অপেক্ষায় গা মোড়া ভাঙছি।একবার অভাগার দিকেও চাও।সব সময় কল্প চরিত্রদের সাথে কথা নাইবা বললে!...এদিকে তোমার বাস্তবের পতিদেব যে অভাবি থেকে যাচ্ছে।সেদিকে খেয়াল রাখো?

মৌমিতা লিখতে, লিখতেই ঘাড় নিচু করে জবাব দিল,জাস্ট দু মিনিট ডিয়ার।রাগ করো না প্লিজ।শেষ করেই আমি তোমার সব বায়নার ইতি ঘটাচ্ছি।...অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় গো।

ঘড়ি দেখে লেখার অভ্যেস মৌমিতার এখন নেই।

একটা সময় ছিল যখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুকে এররাশ উত্তেজনা চাপা রেখে দু,আড়ায় ঘন্টা শক্ত বেঞ্চের উপর বসে মুখ গুঁজে লিখতে হত।

সেদিন থেকেই এই নীতির বীরুদ্ধে তার মনে একটা বিদ্রোহ জন্ম নিয়েছিল।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে।এখন সে মনের আনন্দে শুধু লিখে যায়।

তার লেখনী কথা বলতে শিখল।অগনিত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে বসল।

একটা প্রাইভেট ইস্কুলে পড়ানোর ফাঁকে তার ফেসবুকের ব্লগটিকেও যত্ন সহকারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেল।

প্রতিদিন অসাধারণ সব গল্পের ডালি নিয়ে পাঠক, পাঠিকার সামনে হাজির হয়েছে।

সে যখন মোটামুটি তার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছে গেল।ঠিক সেই সময় তার বাবা একটা ভাল পাত্রের সন্ধান আনলেন।

মৌমিতার সেই মুহূর্তে বিয়ে করার একদম ইচ্ছে ছিল না।

সে আরো কিছুদিন সময় চায়।সে জানত বিয়ের পর আর সেভাবে সময় পাবে না।

এই সময় তার লেখনী একটা শিখরে উন্নিত হয়েছে।হাজার,হাজার রিডারদের গভীর প্রত্যাশা রয়েছে তার উপর।

একজন প্রকাশকও এগিয়ে এসেছেন।তার কয়েকটা গল্প একত্রিত করে একটা সংকলন বের করার জন্য।

রিডারদের কাছে বিপুলহারে সমর্থন পাচ্ছে।সংকলনটা সংগ্রহ করার।

এই সংকলনটা একবার সগৌরবে বেরিয়ে গেলেই সে একটু থিঁতু হতে পারবে।

সাহিত্যের আঙনে একটা লেখার ছাপ উঠে আসবে।

তারপর সে বিয়ে করলেও ক্ষতি নেই।সময় ধরে আস্তে,আস্তে এগিয়ে যাবে অপ্রকাশিত গল্পের দ্বিতীয় একটা সংকলনের দিকে।তখন এত তাড়া থাকবে না।

কিন্তু তার বাবা জিদ ধরে বসে রইলেন।তার কোন কথায় কানে তুলতে রাজি নন।

    অগত্যা মৌমিতাকেই একদিন পাত্রের খোঁজখবর নিয়ে তার ফোন নাম্বারটা জোগাড় করতে হল।

ইস্কুল থেকে ফেরার পথে তাকে ফোন করে পার্কে দেখা করতে বলল।

পাত্রের নাম সুকুমার অধিকারী।

পেশায় ইঞ্জিনিয়ার।

মৌমিতা সুকুমারকে দেখতে যাওয়ার দিনই চিনে নিয়েছিল। তাই পার্কে এক দেখাতেই চিনে ফেলল।

বরং সুকুমারই একটু দ্বিধা নিয়ে বলেছিল,আপনিই মৌ তো?

মৌমিতা কোন রকম উপসংহার ছাড়ায় বলে উঠেছিল,পাশে বসুন।কয়েকটা কথা আছে।

তারপর মৌমিতা শান্তভাবে তার সমস্ত সমস্যাগুলো এক নিশ্বাসে বলে ফেলল।

সব শুনে সুকুমার দুহাতের তালু দিয়ে মুখটা অল্প ঘষে বলে উঠেছিল,এবার বলুন আমাকে ঠিক কী করতে হবে?

মৌমিতা শান্ত গলায় বলে উঠল,অপেক্ষা।

----কতদিন?

----কম করেও একটা বছর।

---যদি বাড়িতে না মেনে নেয়?

---আপনি অন্য মেয়ে দেখে নেবেন।

সুকুমার সেদিন তার বুকের ভেতরটা ঠিকমত দেখানোর চেষ্টা না করেই শুধু "আচ্ছা" বলে উঠে পড়েছিল।

মৌমিতার মনটাও অনেকটা হাল্কা হয়ে ছিল।

দুদিন যাওয়ার পরই খবর আসে পাত্রের বাবা দেনা-পাওনার কথাটা পাঁকা করে রাখতে চান।বিয়েটা এক বছর পরে হলেও ক্ষতি নেই।

সেই শুনে মৌমিতার রাগ চরমে ওঠে এল।

জোর গলায় তার বাবাকে বলে উঠল,একদম না বাবা।এমন কাজটি করবে না বলে দিচ্ছি।টাকা দিয়ে তোমার মেয়ের সুখ কিনতে যেও না। আমি এ বিয়ে করব না। এ বিয়ে কেন,টাকার দাবী তোলা কোন বাড়িতেয় আমি মাথায় সিঁদুর তুলে ঢুকব না। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত ।

তার বাবা অনেক বুঝিয়েও মেয়েকে সেদিন ক্ষান্ত করতে পারেননি।

বাধ্য হয়ে তখন পাত্রের বাবাকে তার মেয়ের অভিমত জানিয়েছিলেন।

ঠিক তার পরের দিনই তার ফোনটা আবার ইস্কুলের কমন রুমে নিশব্দে কেঁপে উঠেছিল।

নামটা ডিলিট করে দিলেও নাম্বারটা বেহায়া মস্তিস্ক ঠিক মনে রেখেছিল।

সুকুমারের ফোন।

একটু নিরিবিলিতে বেরিয়ে ফোনটা রিসিভ করে বলে উঠল,হঠাৎ কী মনে করে?

ও প্রান্তে সুকুমার জবাব দিল,আমি ইস্কুল গেটের পাশেয় দাঁড়িয়ে আছি।পিছন ঘুরলেই দেখতে পাবেন।থাক ঘোরার দরকার নেই।

যা বলছিলাম,আপনার ছুটি হলে একবার দেখা করুন।একটা জিনিস আপনাকে দেখাতে চাই।

মৌমিতা সংক্ষেপে উত্তর দিল,ঠিক আছে।কমন রুমে ঢোকার আগে আড়চোখে পিছনের দিকে একবার তাকিয়েই ফেলল।সত্যি,সত্যিই সুকুমার দাঁড়িয়ে রয়েছে।সেই প্রথম মৌমিতার বুকে একটা ছলাৎ করে শব্দ উঠেছিল।সেটা কীসের ঢেউ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

     বাকি স্টাফদের নজর এড়িয়ে সেদিন মৌমিতা সুকুমারের পাশে হেঁটে গেছিল সামনেই বিশাল একটা দিঘীর পাড়ে।

সম্ভবত ওটা অশ্বত্থ গাছের ঘন ছায়া ছিল।তখন সবে এক ঝাঁক নতুন পাতা,সবুজ হয়ে এসেছে।সামনে টলমল দিঘী।সেখান থেকে ঠান্ডা কখনো গরম বাতাসের ঝাপটা আসছিল। অনুভূতির সেই সুখস্পর্শ তাদের দুজনকে আপন ডোরে বেঁধে ফেলতে চাইছিল।

সুকুমার অবাক ভাবে মৌমিতার দুচোখের দিকে চেয়ে ওর একটা হাত ধরে বলে উঠল,আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি মৌ।আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলেছি।আসলে পুরনো জমিদার বংশের রক্ত তো!...তাই লোভটা আজো রক্তে মিশে রয়েছে।তবে আমার দিকটাও ভেবেছে।

তাই বাবা আর কোন রকম আপত্তি করবে না।তোমাকে ছাড়া আমি সম্পূর্ণ নই মৌ।এটা আমি তোমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই টের পেয়েছি।শুধু হৃদয়ের কপাট খুলে সেই ভালবাসাটুকু তোমায় দেখাতে পারিনি।আজ আমি সেই ভালোবাসাটা তোমাকে দেখানোর জন্যই ডেকেছি।

তাকাও...তাকাও...আমার দুটো চোখের দিকে।বলো তুমি কী দেখতে পাচ্ছো মৌ?..তুমি তো একজন লেখিকা। হাজার,হাজার চরিত্রদের সাথে রোজ কত কথা বলছ! তাহলে আমার দুটি চোখের ভাষা কী তুমি পড়তে পারো না?...বলো...এই দুচোখে কী তুমি অর্থ ক্ষিদে দেখতে পাচ্ছো?...না,সত্যিকার ভালবাসার তৃষ্ণা?

মৌমিতা বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনি।নিজের চোখজোড়া লুকিয়ে বলে উঠেছিল,কিন্তু আমার শর্তটা তোমাকে তো আগেই জানিয়ে রেখেছি সুকুমার।

---জানি।তুমি বেকার দুশ্চিন্তা করছো মৌ।আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারো।কথা দিচ্ছি তোমার লেখায় কোনরকম বিঘ্ন ঘটতে দেব না। তুমি নিশ্চিন্তভাবে তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।শুধু আমি নই, বাড়ির কেউ তোমাকে এ ব্যাপারে কোনরকম বাধা দেবে না।আমি তোমায় কথা দিলাম।এবার বলো।আর তোমার কীসের অসুবিধা?

সত্যি সত্যিই এর পর আর মৌমিতার মুখে বলার মত কোন প্রশ্ন ছিল না।

শুধু সুকুমারের তৃষ্ণিত দুটি নয়ন পানে অল্পক্ষণ চেয়ে বলে উঠেছিল,ভাল আমিও তোমায় বাসি সুকুমার ।তবে আমি তো মেয়ে।তাই সব সময় নিজের ইচ্ছের উপর জয়লাভ করতে পারি না। অনেক চাওয়া,পাওয়াকে বুকের মাঝেয় চেপে রাখতে হয়।না হলে ফোনটা আমিই আগে তোমাকে করতাম।

  তারপর সেদিন তারা উঠে এসেছিল।ক্লান্ত পাখিরা গাছের ডালে ফিরে সান্ধ মজলিশ জুড়েছিল।একটা বয়স্ক অন্ধকার গুটি,গুটি পায়ে চারিদিকটাকে ঢেকে আসছিল।

আর তারা পাশাপাশি হাতে,হাত ছুঁয়ে ফিরছিল মনের খুব কাছাকাছি একটা জায়গায় ।


(তিন)


---কে এসেছিল রে মৌ?

---একজন সিনেমা কম্পানির ডাইরেক্টর।

---ও..তাই!...সেদিন কী তোকে ইনিই ফোন করে খবরা,খবর নিচ্ছিলেন?

---একদম ঠিক ধরেছ।

---তা কী বললেন উনি?

----তিরিশ হাজার টাকায় আমার তিনটে গল্পের স্বত্ত্ব কিনতে রাজি হয়েছেন।অগ্রিম দশ হাজার টাকা দিয়ে বায়নাও করে গেলেন।

-----আমি জানতাম।তুই একদিন ঠিক জিতবি।শুধু তোকে বুঝল না তোর মনের মানুষটা রে মা।আমার দুঃখ শুধু ওইখানটাতেই।

মৌমিতা একটু ধমকের সুরেই বলে উঠল,তুমি চুপ করো তো মা।আমার ওসব পুরনো কথা বার, বার শুনতে একদম ভাল লাগে না। জাস্ট বিরক্ত ধরে গেছে।

    ওঘর থেকে তখনি একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এল।

সাধনাদেবী একটু হেসে বলে উঠলেন,যা গিয়ে সুধা ঢাল নবাবের মুখে,না হলে আবার ওর মেজাজ ঘুরবে না।

ঘুম ভেঙে গেছে বোধ হয়।

মৌমিতা দৌঁড়ে গেল।

গিয়েই তিন বছরের সাহেবর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,এই তো বাবা আমি।এসো সোনা।দুদু খাবে বাবা?

সাহেব কান্না থামিয়ে ওর মায়ের কোলে টুক করে উঠে এল।

মৌমিতা বুকের কাপড় সরিয়ে ছেলের হাঁ করা মুখটায় একটা স্তন ভরে দিল।

তার মাতৃ হৃদয় নেচে উঠল। সাহেবের গায়ে কয়েককটা আদুরে হামি দিয়ে সামান্য আনমোনা হয়ে পড়ল। এই সংসারে ছোট্ট সাহেব ছাড়া তার আর আপন বলতে আছেই বা কে?

তারজন্য সে অনেক যুদ্ধ করেছে।

সেদিনগুলোর কথা মনে করলে আজো বুকটা মুচড়ে ওঠে।

এক সময় চেনা,জানা মানুষগুলোও কেমন নিমেষে চেহারা পাল্টে ফেলে!!

মনে হয় সকলেই মুখোশ পরে ঘুরছে!

আসল চেহারা যে কোনটা কার সেটাই ঠিকমত বোঝা যায় না।

না হলে সুকুমারের মত একজন স্বামীরূপী প্রেমিকও এভাবে পাল্টে যায়?

তাকে চরম দুর্দিনে একা ফেলে স্বার্থপরের মত পালায়?


Post a Comment

Previous Post Next Post